
নিজস্ব প্রতিনিধি: দেশজুড়ে কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে কৃষিখাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। মাঠের পর মাঠ এখন পানির নিচে। কোথাও আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে, কোথাও আউশ ধান ডুবে গেছে, আবার কোথাও সবজি ও মসলাজাতীয় ফসল পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে শুধু কৃষকরাই নয়, ভবিষ্যতে খাদ্য সরবরাহ ও বাজারদর নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণের প্রভাবে ৪৩টি জেলার কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতির তালিকায় রয়েছে ৭৯ হাজার ৫০০ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ১৭ হাজার ৮০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি। এছাড়া আদা, হলুদ, পেঁপেসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার খলশিবুনিয়া গ্রামের কৃষক প্রসাদ রায় চলতি আমন মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় ১০ কাঠা জমিতে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল সেই চারা দিয়ে ১৭ বিঘা জমিতে ধান চাষ করবেন।
কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পুরো বীজতলা পানির নিচে চলে যায়। শ্যালো পাম্প দিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। শেষ পর্যন্ত সব চারা নষ্ট হয়ে যায়।
এখন নতুন করে আবার বীজতলা তৈরি করতে হবে, যার অর্থ অতিরিক্ত ব্যয় এবং নতুন অনিশ্চয়তা। তার মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু বৃষ্টি নয়; দীর্ঘদিন ধরে নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন এলাকায় সবজির ক্ষেত পচে যাচ্ছে। নতুন রোপণ করা চারাগুলোও টিকে থাকতে পারছে না।
খুলনার আরেক কৃষক মিরিন গোলদার আগাম শিম চাষে ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। অতিবৃষ্টিতে তার প্রায় অর্ধেক চারা নষ্ট হয়ে গেছে।
অন্যদিকে পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় পানচাষিরাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাউফল উপজেলার কয়েকজন কৃষকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু তাদের কয়েকটি বরজেই সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা।
অনেক কৃষকের কাছে এই বরজই ছিল একমাত্র আয়ের উৎস। ফলে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ব্যয় মেটানো নিয়েও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
পটুয়াখালীর কৃষক ফারুক হোসেন এক একর জমিতে আমনের বীজতলা করেছিলেন। বর্তমানে পুরো জমি হাঁটুসমান পানির নিচে।
পানি দ্রুত না নামলে নতুন করে বীজ কিনে আবার বীজতলা তৈরি করতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি মৌসুমের সময়ও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি শুধু একজন নন; একই জেলার অধিকাংশ কৃষকই একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিজমির এই ক্ষয়ক্ষতি ভবিষ্যতে বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে সবজি, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা শুধু ফসল নয়, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছের খামার এবং পশুখাদ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির একাধিক খাত একই সঙ্গে চাপে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে আমন ধানের বীজ, আগাম শীতকালীন সবজির বীজ এবং প্রয়োজনীয় সার সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা দ্রুত আবার উৎপাদনে ফিরতে পারেন।
সরকারের নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসনও বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছে। ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব শেষ হলে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। এর আগে ১১ জুলাই তিনি জানিয়েছিলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য পৃথক তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, ক্ষতির চূড়ান্ত মাত্রা নির্ভর করবে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
তার মতে, যদি দ্রুত পানি নেমে যায়, তাহলে অনেক ফসল আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার হতে পারে। কিন্তু জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের মোট আবাদি জমির তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ খুব বেশি না হলেও যেসব অঞ্চলে এই দুর্যোগ আঘাত হেনেছে, সেখানে কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা, উন্নত মানের বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, গবাদিপশুর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল, তিস্তা অববাহিকা, সিলেট ও সুনামগঞ্জের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য নতুন বন্যার বিষয়েও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
এবারের ভারী বর্ষণ শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি দেশের কৃষি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক এলাকায় নদী, খাল ও জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের অতিবৃষ্টিও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিচ্ছে।
যদি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে এই ক্ষতির প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আগামী মৌসুমের উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।