
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকি, পণ্য লোপাট, চোরাচালান, ওজন কারসাজি,মামলা, যেন মামুলি ঘটনা। একেরপর এক ঘটনা প্রকাশ হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে মূল হোতারা। সোমবার (১৩ জুলাই) দুপরে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে কাগজপত্রবিহীন ১৯ প্যাকেজ উচ্চমূল্যের শাড়ি,থ্রিপিস ও কসমেটিক্স পণ্য উদ্ধার করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বন্দর জুড়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বন্দরে শুল্ক ফাঁকি,পণ্য লোপাট,মামলা সবই যেন মামুলি ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। আর ধরাছোঁয়ার বাইরে অধরাই থাকছে মূল হোতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত (১২ মার্চ) রাতে বেনাপোল বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা বেকিং পাউডার ঘোষণায় ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনী চালান আটক করে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। বন্দরের জিম্মায় রাখা সকল পণ্য চালান গায়েব হয়ে তার বদলে সেখানে অতি নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিসসহ অন্যান্য সামগ্রী রাখা হয়। এ পন্য চালান লোপাটের ঘটনায় পণ্যের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব পরিশোধের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেই কাস্টমস। পরে এ ঘটনায় গত ৯ জুন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বেনাপোল পোর্ট থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৮/১০ জনকে আসামিকরে মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং-৯। তবে এই মামলায় এখন পর্যন্ত কেও আটক হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, আটক ১৯ প্যাকেজ পণ্য চালানে মূলত ৪০ প্যাকেজ পণ্য ছিলো যা আগে ভাগেই ২১ প্যাকেজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৯ প্যাকেজ পণ্য আটক হয়। এ কাজে জড়িত বন্দরের ৩৭ শেড ইনচার্জ আবুল খায়েরের যোগসাজসে কাগজপত্রবিহীন ঘোষণাবর্হিভূত ৪০ প্যাকেজ পণ্য নামায় শুল্ক ফাঁকি চক্র। যার ২১ প্যাকেজ পণ্য পাচার হয়ে চলে গেছে। তবে এ ঘটনাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে কাস্টমস ও বন্দর নিখোঁজ পণ্য চালান জব্দ বলে প্রচার করছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, আটক ১৯ প্যাকেজ পণ্য চালানে ১৩ প্যাকেজে শাড়ি,বেবি ওয়্যার,থ্রিপিস পাওয়া গেছে যার ওজন ৪৮৯ কেজি এবং ০৬ প্যাকেজে ১১৬ কেজি কসমেটিক্স পাওয়া গেছে। যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা।
এদিকে গত ৪ মাস আগে আটক হওয়া ৩২ নম্বর ও ৩৪ নং শেডে থাকা ভায়গ্রার দুটি চালান পাচার হওয়ার সংশয় দেখা দেওয়ায় কাস্টমস বন্দরকে চিঠি দিয়েছে। সরেজমিনে,কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শেডে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আল-আরাফাত এর নিরাপত্তাকর্মী এবং বন্দরের গোয়েন্দা সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বন্দরের আরেকটি শেডে দীর্ঘদিন ধরে ভায়াগ্রা সন্দেহে জব্দ থাকা চালানেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব ভয়ংকর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবিত পণ্য চালান ধংস না হওয়ায় কাস্টমস কমিশনারের দিকে প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টমস আইন অনুযায়ী,আমদানি পণ্য খালাসের ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক পণ্য গ্রহণ না করলে তা কাস্টমসের মাধ্যমে নিলাম বা ধ্বংস করার কথা। কিন্তু মাসের পর মাস ও বছর পার হলেও বিপুলসংখ্যক অখালাসকৃত পণ্য চালান বন্দরে পড়ে থাকে। এ কাজে নিলাম বা ধংস না হওয়ার পেছনেও সিন্ডিকেট কাজ করে। সময় সুযোগ বুঝে আমদানি নিশিদ্ধ,কাগজপত্রবিহীন পণ্য শেড থেকে এক সময় উধাও করে দেই। অখালাসকৃত পণ্য বছরের পর বছর বন্দরে ফেলে রাখা ও লোপাট ও চুরির প্রবণতা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের নিবন্ধন বাতিল, কালো তালিকাভুক্তিসহ অর্থ পাচারসংশ্লিষ্ট মামলা দিয়ে দ্রুত নিস্পত্তির দাবি জানিয়েছে বন্দর ব্যবহারকারি ব্যবসায়ীরা।
আমদানিকারক মোহাম্মদ আলী, বেনাপোল বন্দরের ৩৭ নং শেড জাদুর শেডে পরিণত হয়েছে। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য নামানো,জব্দ পণ্য চালান গায়েব আবার নতুন পণ্য চালান আটক সবই যেন আলাদ্বিনের প্রদিপের মতো হচ্ছে। আরও কিছু ঘটলে এই জাদুর শেডকে সংরক্ষণ করতে হতে পারে। বন্দরে আমদানি পণ্য রাখার মাশুল গুনতে নয় যেন ভিআইপি মাশুলে চলছে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি। এর সাথে জড়িত কাস্টমস ও বন্দরের পরস্পর যোগসাজসে গড়ে উঠা দীর্ঘ দিনের শক্তিশালি চক্রের হাত ধরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি চলছে। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, অত্যাধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র মিথ্যা ঘোষণায় ঘোষণাবর্হিভূত ও নিষিদ্ধ পণ্য আমদানির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি প্রায় ১৫ কোটি টাকার আমদানি পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তাকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকসহ ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক রয়েছে। তাছাড়া অভিযুক্তদেরকে নাম মাত্র বহিস্কার ও তদন্ত কমিটির নামে তালবাহানায় চলছে সব কারসাজি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিভিন্ন সময় পণ্যগার থেকে অবৈধভাবে পণ্য বের করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। আর এত কিছুর পরও বন্দর ও কাস্টমসের উর্দ্ধত্বন কর্মকর্তাদের গায়ে টিকিটি হাওয়াও লাগছে না। একই সাথে বদলির আগেই আখের গোছাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে অসাধু কর্মকর্তারা। কাস্টমস কমিশনার ফাইজুর রহমান ও জয়েন্ট কমিশনার সাইদ আহমেদ রুবেলের গোপন আঁতাতে এসব চলছে। তাছাড়া নীতিবান ও সৎ যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়াকে কোন ঠাঁসা করে তাকে দায়িত্ব থেকে দুরে রেখেছেন।
স্থানীয়রা জানান, গত ১৫ মার্চ ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মেসার্স আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ভারত থেকে প্রায় ১৬ টন ‘কোয়ার্টজ পাউডার’ আমদানি করে। যার বি/ই নং-১৯০৪২ তারিখ:১৫/০৩/২৬ইং। পণ্য চালানটির নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠালে সেখানে তিন হাজার ৬৭৫ কেজি সিলডেনাফিল সাইট্রেট ভায়গ্রা পাওয়া যায়। পণ্য চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল বেনাপোলের হায়দার অ্যান্ড সন্স নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। অথচ ভায়গ্রার মতো ভয়ংকর একটি চালান জব্দের পরও কমিশনার ফাইজুর রহমান ও জয়েন্ট কমিশনার সাইদ আহমেদ রুবেল সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্টানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেইনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ি জানান, কাস্টমস কমিশনার ও যুগ্ন কমিশনার রুবেলের কারসাজিতে বেনাপোলে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে। কমিশনার ফাইজুর রহমান, জেসি রুবেল মিলে কাস্টম হাউস ঘুষের রাজ্যে পরিণত করেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীকে গোপনে শুভংকরের ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। বর্তমান দায়িত্বরত কমিশনার ফাইজুর ও রুবেলের নগদ অর্থসহ সকল সম্পদ সম্পত্তির খোঁজে সংশ্লিষ্টদের মাঠে নামার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের সম্পদ খুঁজলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে বলে বেনাপোলের একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট দাবি করেছেন।
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন বলেন, উদ্ধার হওয়া ১৯ প্যাকেজ পণ্য আগের জব্দ করা চালানেরই অংশ হবে। এগুলো শেডের ভেতরে নিলাম পণ্যের স্তূপের নিচে চাপা পড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই ঘটনার পেছনে বন্দরের কারও কোনো অনিয়ম বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার তৌফিকুর রহমান জানান, উদ্ধার হওয়া পণ্যগুলো গণনা ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ না করায় কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।