
নিজস্ব প্রতিনিধি: বেনাপোল বন্দরের ৩৭ নং শেড থেকে ৬ কোটি টাকার জব্দ পণ্য গায়েবের ঘটনার সাথে জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তা মাহিদুল অধরা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বন্দরের ভংয়কর শুল্ক ফাঁকি সিন্ডিকেটের শীর্ষ নের্তৃত্বে দানকারি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল, প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু পরিচয়দানকারী বগুড়ার হিরু ও অস্ত্র ব্যবসায়ী আজিম, রুহুল কুদ্দুস অরফে আনোয়ার ও মনিরসহ সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ মার্চ বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে ৬ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির পণ্য চালান জব্দ করা হয়। রহস্যজনকভাবে বন্দরের জিম্মায় রাখা শুল্ক ফাঁকির সেই চালান থেকে গায়েব হয়ে গেছে (উচ্চ শুল্কযুক্ত) দামি ভারতীয় পণ্য। তার বদলে সেখানে রাখা হয়েছে অতি নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিসসহ অন্যান্য সামগ্রী। এই ঘটনায় গত ৯ (জুন) কাস্টমস বাদি হয়ে ১০ জনের নামে মামলা করে। যার মামলা নং-০৯,কাস্টম আইন, ২০২৩ এর ধারা- ৪০৬/৪০৯/৪২০/৪৬৫/৩৪। অথচ এই পণ্য গায়েবের সাথে জড়িত রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলামকে আসামি করেনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম-১ এবং বন্দরের আশিকুর রহমান রনি একই এলাকার হওয়ায় যৌথ প্যাকেজে স্কেল ওজনে কারচুপি ও জাল নথিপত্র তৈরি করে পণ্য খালাসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কাস্টমসের ৬ কোটি টাকার আটক পণ্য চালান পাচারের সাথে তারা পরস্পর জড়িত রয়েছে। তাছাড়া রিয়াদ এজেন্সির কর্মচারি রুহুল কুদ্দুস অরফে আনোয়ারের যোগসাজসে ৬০ লাখ টাকা রফাদফায় এ পণ্য চালান সরানো হয়।
কাস্টমস সূত্র জানায়, ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল ও ২০ মে পৃথক তিনটি চিঠিতে চালানটির ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কোরবানি ঈদের ছুটির মধ্যে তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেডে রাখা চালান থেকে জব্দ করা ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পরে সেখানে দেশীয় নিম্নমানের বিকল্প পণ্য রাখা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দারা বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করলে ২ জুন বন্দর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে চালানটি পুনরায় কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরীক্ষায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এর আগেও ‘হুদা ইন্টারন্যাশনাল’ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বেনাপোল দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা গত (২২ অক্টোবর) বন্দরের ৪২ পণ্যগার থেকে ঘোষণা বর্হিভূত ১০ লাখ ৮০ হাজার জিলেট ব্লেড ও তিন প্যাকেজ অতিরিক্ত ঘোষণা বহির্ভূত পণ্যসহ আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তবে সে যাত্রায় কাস্টমসের এক উর্দ্ধত্বন কর্মকর্তাকে মোটা অংকে মনরঞ্জন করে ছাড় পেয়েছে। এ পণ্য চালানের সাথে মাহিদুল ও খড়িডাঙ্গার আনোয়ারের কারসাজিতে সে চালান ও ছাড় পায়। এসময় মাহিদুল (আইএরএম) শাখার দায়িত্বে ছিলো।
স্থানীয় সচেতন মহল জানান, পণ্য চুরি ও গায়েবের কারনে যদি বন্দরের শেড ইনচার্জ, ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফের নামে মামলা হয়। তাহলে জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তা মাহিদুলের নামে কেন মামলা হবে না ?। নিশ্চিয় এসব অবৈধ সিন্ডিকেটের সাথে খোদ কাস্টমস কমিশনার জড়িত। অভিযোগ রয়েছে,বেনাপোল বন্দরে সকল অপকর্মের সাথে কমিশনারের গোপন আঁতাত রয়েছে। আর এসব অবৈধ লেনদেনের টাকা ঢাকায় তার এক আত্মিয় গ্রহন করছেন।
এ বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-১ বলেন, আমার সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা নেই। আমি কার্গো শাখায় দায়িত্ব পালন করি। সম্প্রতি ৩৭ নং শেডের একটি ঘটনায় এলাকার লোক হিসেবে ওয়্যারহাউজ সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনিকে সহযোগিতা করেছিলাম। আশিকুর রহমান রনি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও ৩৭ নং শেডে কেন তাকে সহযোগিতা করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওখানে তারই কাছের কলিগ চাকরি করে সে করনে সহযোগিতা করেছিলাম।
সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ঘটনা কেবল একটি চালান গায়েব নয় এটি বন্দরের ভেতরে গজিয়ে ওঠা ভয়ঙ্কর শকুনের থাবা। যে থাবায় আক্রান্ত হয়েছে প্রশাসনের নৈতিক ভিত্তি। আর বন্দরের ভেতরকার অসাধু কর্মকর্তার বহুদিনের অনিয়ম, দুর্বলতা ও দায়হীনতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি। যা সরকারের রাজস্ব আদায়ের জন্য বড় সতর্ক সংকেত আর হুমকির মুখে পড়েছে রাজস্ব আদায়। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের যোগসাজশে আমদানি নিশিদ্ধ,ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য,নো-এন্ট্রি, কাগজপত্রবিহীন পণ্য খালাস এবং উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্ক পণ্য দেখিয়ে রাজস্ব লুটের উৎসব। ফলে বিগত অর্থবছরে ছ ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে।
এবিষয়ে বেনাপোল পোর্ট থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান জানান, আসামিদের আটকের চেষ্ঠা চলছে। এদিকে মামলার এক মাস অতিবাহিত হলেও কোন আসামিকে আটক করতে পরেনি পোর্ট থানা পুলিশ।