
অনলাইন ডেস্ক:দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের সাবেক ‘কল্যাণ সহকারী’ মো. হানিফ খোকনকে অবৈধভাবে চাকরিচ্যুত করা ও আবেদনের ৯ মাস পরও তার ভিসা বাতিল না করার অভিযোগ উঠেছে কনস্যুলেটের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ফলে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার ১৫০ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা) জরিমানার মুখে পড়ে তিনি দুবাইয়ে অবৈধ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভিসা জটিলতার কারণে দেশে ফিরতেও পারছেন না বলে দাবি করেছেন তিনি।
তবে কনস্যুলেট কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, চাকরিচ্যুতির পর প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র জমা না দেওয়ায় হানিফ খোকনের ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত ৩ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো এক লিখিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মো. হানিফ দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর তাকে চাকরি থেকে অবৈধভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে তার ভিসা বাতিল না করায় তিনি অন্য কোথাও চাকরি নিতে কিংবা বাংলাদেশে ফিরতে পারছেন না।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি জানান, ২০১২ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দুবাইস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে ‘কল্যাণ সহকারী’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার দাবি, ২০২৩ সালে তৎকালীন কাউন্সেলর (শ্রম) মো. আব্দুস সালাম দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতা করার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডিমান্ড লেটার সংগ্রহ এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত বাসার বিল অফিসের নামে পরিবর্তন করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তাতে রাজি হননি। এরপর থেকেই তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয় এবং চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হানিফের অভিযোগ, কাউন্সেলর আব্দুস সালাম ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে প্রায়ই নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরের লোক এবং মাহবুব-উল-আলম হানিফের আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন। পরে তৎকালীন এক তদন্তের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হয়। সেই প্রতিবেদনে তার পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত- এমন তথ্য উল্লেখ করে কোনো নিয়মতান্ত্রিক তদন্ত ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
হানিফের দাবি, পরিবারের সদস্যদের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত তার চাকরি হারানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই পরবর্তীতেও তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে তার ভিসা বাতিল না করে দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে তিনি আর্থিক ও মানবিক সংকটে পড়েন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন কনসাল জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন জানালে তিনি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও কাউন্সেলর (শ্রম) মো. আব্দুস সালামের আপত্তির কারণে বিষয়টি আর এগোয়নি। পরবর্তীতে বর্তমান কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামানের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগ করলেও চাকরিতে পুনর্বহাল বা ভিসা বাতিল- কোনোটিই হয়নি।
হানিফের দাবি, ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়। এরপর ৮ অক্টোবর ই-মেইলের মাধ্যমে কনস্যুলেটের কাছে ভিসা বাতিলের আবেদন করেন। সে সময় তার নামে কোনো জরিমানা ছিল না এবং ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়াটি এক দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে তার ভিসা বাতিল করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার নামে প্রায় ১৩ হাজার ১৫০ দিরহাম জরিমানা আরোপ হয়।
হানিফ আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামান, সাবেক কাউন্সেলর (শ্রম) মো. আব্দুস সালাম এবং এক প্রটোকল কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি চক্র তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল না করে ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়াও ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখে।
তিনি জানান, চাকরি হারানোর পর ভিসা জটিলতার কারণে অন্যত্র চাকরির সুযোগও হাতছাড়া হয়েছে। চরম আর্থিক সংকটে পড়ে তিন সন্তানের লেখাপড়া ও চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ঋণ করে গত ২ জুন স্ত্রী ও সন্তানদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলেও নিজে ভিসা জটিলতার কারণে দেশে ফিরতে পারছেন না এবং দুবাইয়ে অবৈধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
হানিফ আরও অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরার পর তার বিরুদ্ধে ‘আর্থিক অনিয়মের’ অভিযোগ ছড়ানো হয় এবং জনতা ব্যাংক থেকে নেওয়া তার ব্যক্তিগত ঋণের তথ্যও প্রকাশ করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কনস্যুলেট কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগেরও প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারলে তিনি আর কখনো চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি করবেন না বলেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামান সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, যদিও আমি ওই সময় ছিলাম না। তবে আমি জানতে পেরেছি হানিফ খোকনের অভিযোগের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার কোনো মিল নেই। তার ভাষ্য, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে অসদাচরণ, দায়িত্বে অবহেলা এবং ভিসা সত্যায়ন-সংক্রান্ত কাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে হানিফকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, চাকরি থেকে অব্যাহতির পর হানিফ কনস্যুলেটের স্পন্সরশিপে ইস্যু করা অফিসিয়াল কনস্যুলার আইডি ও এমিরেটস আইডি নিয়ম অনুযায়ী ফেরত দেননি। একাধিকবার টেলিফোনে যোগাযোগ করে আইডিগুলো জমা দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এ কারণে কনস্যুলেটের পক্ষে তার ভিসা বাতিলের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কনস্যুলেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন কনসাল জেনারেল।
রাশেদুজ্জামান আরও বলেন, ‘দুই বছরে যদি তিনি ইচ্ছা করতেন, তাহলে অবশ্যই দেশে ফিরতে পারতেন। আমি কেন তাকে আটকে রাখব? তিনি যদি জরিমানার টাকা পরিশোধ করে দেশে যেতে চান, আমরা অব্যশই তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দেব। কারও ব্যক্তিগত জরিমানার অর্থ কনস্যুলেট পরিশোধ করবে না।’